লাহৌরেও লো ফ্লাইং জোনে বিদেশি বিমান নিষিদ্ধ, যুদ্ধের প্রস্তুতি পাকিস্তানের?

বড়সড় আকাশ-হানাদারির ফন্দি আঁটছে পাকিস্তান? পঞ্জাব ও কাশ্মীরের আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও নিয়ন্ত্রণরেখায় কি বড়সড় যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসলামাবাদ? তেমনই ইঙ্গিত মিলেছে পাক প্রশাসনের সাম্প্রতিক একটি ‘ফতোয়া’য়। কোনও বিদেশি বিমান সংস্থার উড়ান যাতে আকাশে ৩৩ হাজার ফুটের নীচ দিয়ে না ওড়ে, সে জন্য গত সোমবারই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল করাচি বিমানবন্দরে।

এ বার সেই উচ্চতা আরও কমিয়ে দিল পাকিস্তান। জানানো হল, ২৯ হাজার ফুটের নীচ দিয়ে যেন কোনও বিদেশি বিমান সংস্থার উড়ানই না ওড়ে লাহৌরের আকাশে। অসমর্থিত সূত্রের খবর, গোটা পাকিস্তানের আকাশেই যাতে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিদেশি বিমান সংস্থার উড়ানগুলি ২৯ হাজার ফুট উচ্চতার নীচ দিয়ে না ওড়ে, সে জন্যও সরকারি নির্দেশ জারির কথা ভাবছে ইসলামাবাদ। মানে, বিদেশি বিমান সংস্থাগুলির জন্য করাচি, লাহৌরে লো ফ্লাইং এক রকম বন্ধই করে দেওয়া হল, আপাতত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘‘এই পাক ফতোয়াটি খুবই ইঙ্গিতবাহী। করাচির আকাশ-সীমার ওপর দিয়ে ওড়ার জন্য যে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, সেটি ছিল এক সপ্তাহের জন্য। কিন্তু লাহৌরের ক্ষেত্রে সেই সময়-সীমাটি অনেকটা লম্বা। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। যেহেতু যুদ্ধবিমানগুলি আকাশে খুব অল্প উচ্চতায় ওড়ে, তাই সেগুলির মহড়া বা আগামী দিনে বৃহত্তর প্রয়োজনে (পড়ুন, যুদ্ধে) সেগুলির ব্যবহারের জন্যই হয়তো এই নির্দেশ জারি করা হয়েছে পাকিস্তানে।’’

এর ফলে পাকিস্তানের ওপর দিয়ে ওড়া বিমানগুলির চলাচলে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে বিমান সংস্থাগুলির আশঙ্কা। এয়ার ইন্ডিয়ার (পাকিস্তানের কাছে বিদেশি বিমান সংস্থা) এক পদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘‘ওই নির্দেশের ফলে পাকিস্তানের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে যে বিমানগুলি পশ্চিমের দেশ বা উপসাগরীয় দেশগুলিতে যায়, সেগুলির আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে সময়টা অনেকটাই বেশি লাগবে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে।

যেহেতু উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম ভারত থেকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও উপসাগরীয় দেশগুলিতে যাওয়ার জন্য এয়ার ইন্ডিয়ার সবকর্টি বিমানই এখন পাকিস্তানের ওপর দিয়ে উড়ে যায়, তাই আমাদের এখন ওই সব দেশে যাওয়ার জন্য অন্য রুট ধরতে হবে। ফলে, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে সময় বেশি লাগবে।’’ তবে পাকিস্তান যে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য যুদ্ধবিমানগুলির মহড়া দিচ্ছে লাহৌর ও করাচির আকাশে, তা ভারতীয় বিমানবাহিনীরও অজানা নেই।

বিমানবাহিনীর এক পদস্থ কর্মকর্তার কথায়, ‘‘আমরা বেশ কিছু দিন আগেই খবর পেয়েছি, লাহৌর আর করাচির আকাশে পাক যুদ্ধবিমানগুলি সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। আর সেই মহড়াটা চলছে অনেক ক্ষণ ধরে। বিশেষ করে রাতে, গভীর রাতে। বিদেশি বিমান সংস্থাগুলির উড়ানগুলি ওই সময়েই সাধারণত পাকিস্তানের ওপর দিয়ে আসা-যাওয়া করে।’’

ভারতীয় বিমানবাহিনীর আরেক পদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘‘পাক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের এই নির্দেশ আমাদের আরও বেশি ইঙ্গিতবাহী মনে হচ্ছে এই কারণেই, কারণ রাজস্থান আর গুজরাত সীমান্তের খুব কাছেই রয়েছে করাচি। আর জম্মু-কাশ্মীরের আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও নিয়ন্ত্রণরেখার প্রায় ছিল ছোড়া দূরত্বে রয়েছে লাহৌর। এই দু’টি সীমান্তেই কড়া নজর রাখছে ভারতীয় বিমানবাহিনী। বিষয়টা আরও বেশি ইঙ্গিতবাহী এই কারণেই যে, কাশ্মীর সীমান্ত লাগোয়া লাহৌরের ওপর দিয়ে বিদেশি বিমানগুলি ওড়ার ব্যাপারে নির্দেশটা জারি করা হয়েছে দীর্ঘতর মেয়াদের জন্য।

লাহৌরেই রয়েছে পাকিস্তানের মূল পরমাণু কেন্দ্রটি, রয়েছে পাক পরমাণু অস্ত্রশস্ত্রের মূল ভাঁড়ারও। তাই সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্ততি নিতেই যে পাক প্রশাসনের এই নির্দেশ, সেই বিশ্বাসটা আরও জোরালো হচ্ছে।’’ ভারতের অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের এক পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, অসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি রয়েছে, তার এখনও লাগু থাকবে কি না, বা তার কিছু সংশোধন, পরিমার্জন করা হবে কি না এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) যে বিমানগুলি ভারতের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে অন্যান্য দেশে যায়, সেগুলির ওপরেও ভারতের তরফে কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও উপসাগরীয় দেশগুলিতে যাওয়ার জন্য কোন বিকল্প রুটের কথা ভাবছে?

অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘‘সরাসরি জম্মু-কাশ্মীরের ওপর দিয়েই বিমানগুলিকে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। তার পর এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানগুলি ঢুকে পড়বে চিনের আকাশ-সীমায়। সেখান থেকে বাঁ দিকে ঘুরে যাবে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানগুলি। তবে সেটা চিনা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।’’ — আনন্দবাজার