লালমনিরহাটে দাদন ব্যবসায় নিঃস্ব হচ্ছে অসহায় মানুষ

আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট প্রতিনিধি: সন্ত্রাস, মাদক, জুয়ার মত চক্রবৃদ্ধিহার সুদে দাদন ব্যবসায়ী কোন অংশে কম নয়। এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানে নামা উচিৎ বলে মনে করেন শুষিল ও যুব সমাজসহ আপাময় জনসাধারণ।

লালমনিরহাট জেলার পাঁচ উপজেলার পাটগ্রাম,কালীগঞ্জ,হাতীবান্ধা, আদিতমারী,লালমনিরহাট সদরসহ জেলায় চক্রবৃদ্ধি সুদে দাদন ব্যবসায়ীর দৌড়াত্ব দিনদিন বেড়েই চলেছে। সামান্য পুজি নিয়ে দাদন ব্যবসা শুরু করে আজ অনেকেই কোটিপতি বনে গেছেন। অনেকেই আবার এদের খপ্পরে পড়ে ব্যবসাবাণিজ্য, ভিটেমাটি ও সয়সম্বল সব হাড়িয়ে দেশান্তরি হয়ে গেছেন।

দেশের উন্নয়নে প্রধান প্রতিবন্ধকতা সুদ, ঘুষ আর দুর্নীতি। এনজিও, ব্যাংক, বীমার বাৎসরিক সুদের হাড় ১৫-২০% টাকা। যথা সময়ে এই সুদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়েছে এটা নিশ্চয়ই কারও অজানা নাই।এনজিও, ব্যাংক, বীমার সুদের চাইতে শতগুণ উপড়ে দাদন ব্যবসা। এন্টি ভাইরাসের মতো এরা দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা সমাজের কেহই।

এরা সমাজ, দেশ ও জাতীর জন্য খুবই ভয়ংকর। সন্ত্রাস, মাদক ও জুয়ার মতো এখনেই এদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা না গেলে সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। বলে মনে করেন লালমনিরহাট জেলার আপাময় জনসাধারণ। চক্রবৃদ্ধি সুদে দাদন ব্যবসা সমাজের জন্য ক্ষতিকর- সন্ত্রাস, মাদক জুয়ার মতো কোন অংশে কম নয়। একদিকে এরা বিপদে পড়া অভাবগ্রস্ত অসহায় মানুষের রক্ত তিলে তিলে চুষে খাচ্ছে।

অপর দিকে এরা মহান আল্লাহ তায়ালার আইনকে না মেনে, তার সাথে যুদ্ধ করছেন।কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তি, নেতাকর্মীর বিপদে আর জনপ্রতিনিধির নির্বাচনে দাদন ব্যবসায়ীরা সবচাইতে বেশি টাকা ডোনেট করে থাকেন। ফলে সমাজে এদেরই দাফট বেশি। ঐসব নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি এদের কথায় উঠবস করে থাকেন।

আইনগত কোন কঠিন ঝামেলা না থাকায় এই ব্যবসার প্রতি ঝুকে পড়ছে জেলার স্বর্ন ব্যবসায়ী, হোটেল ব্যবসায়ী সাধারণ ব্যবসায়ী, মাদক ব্যবসায়ী, ডিলার ব্যবসায়ী, ইউপি সদস্য, চাকরীজীবি রাজনীতিবিদ, নারীসহ কয়েক হাজার লোক এই ব্যবসায় জড়িত।অপরদিকে তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না- রিক্সা ওয়ালা, দিনমকজুর, কৃষক, ছাত্র- শিক্ষক, চেয়ারম্যান, মেম্বার, ঠিকাদার, রাজনীতিবিদ, চাকরীজীবিসহ সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

দাদন ব্যবসা পরিচালনা করার সুবিধার্থে কিছু অসাধু নেতা, কর্মী আর জনপ্রতিনিধিকে ব্যহার করেন তারা। ফলে এরা অত্যন্ত ক্ষমতাধর আর প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেহই প্রতিবাদ করার সাহস পান না। অনেকেই আবার তাদের খপ্পরে পড়ে ব্যবসাবাণিজ্য, ভিটেমাটি ও সয়সম্বল সব হাড়িয়ে দেশান্তরি হয়ে গেছেন।দাদন ব্যবসার ধরণও ভিন্নরুপ-চুক্তি ভিত্তিক, দিন কিস্তি, সাপ্তাহিক কিস্তি ও মাসিক কিস্তি।

তবে মাসিক কিস্তির চাইতে চুক্তি ভিত্তিক আর দিনকিস্তিতে সুদের হাড় সর্বোচ্চ। চুক্তি ভিত্তিতে সকালে কেউ ১ লক্ষ টাকা নিলে বিকালে বা রাতে ১ লক্ষ ২/৩ হাজার টাকা দিতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে সুদের হাড় দ্বিগুণ দিতে হবে। দিনকিস্তিতে সর্বমোট মাসিক সুদের হাড় লাখে ৩০ হাজার থেকে ৬০ টাকা। মাসিক কিস্তিতে সুদের হাড় ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।

চক্রবৃদ্ধি সুদে সাধারণ টাকা নেন, শিক্ষা, চাকরী, চিকিৎসা, পাওনাদার টাকা পরিশোধের টাকার জন্য বিপদে পড়ে অসহায় মানুষজন। বিভিন্ন কোম্পানির ডিলার ব্যাংকে ডিডি বা টিডি করার সময় ঘন্টা চুক্তিতে চক্রবৃদ্ধি সুদে টাকা নেন। ঔষধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি মাসের শেষে টার্গেট পুরনে ব্যর্থ হলে মোটরসাইকেল বন্ধন রেখে চক্রবৃদ্ধি সুদে টাকা নিয়ে থাকেন। অনেকেই আবার দাদন ব্যবসায়ীর সুদেত চাপে তাদের মোটরসাইকেল ও চাকরী ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

নির্দিষ্ট সময়ে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে স্বর্ণ অফিরত যোগ্য। এই শর্তে স্বর্ণ জমা রাখেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। মাসিক ১৫-২০% সুদে স্বর্ণের বাজার মুল্যের ৫০% টাকা দাদনে দিয়ে থাকেন।দাদন ব্যবসায়ীরা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষক আর আধাসরকারী কর্মকর্তা- কর্মচারীদের সাক্ষরযুক্ত চেকবহি জমা রেখে মাসিক ১৫/২০ সুদে দাদনে টাকা দিয়ে থাকে। ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীর সাথে দাদন ব্যবসায়ীর যোগসাজশ থাকে।

ফলে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করার অন্য কোন উপায় থাকেনা।সাধারন ব্যবসায়ীদেরকে নন জুডিশিয়াল সাদা স্টাম্প, ফাকা চেকে সাক্ষর নিয়ে চক্রবৃদ্ধি সুদে দিন কিস্তিতে টাকা দেন দাদন ব্যবসায়ীরা। কোন ব্যবসায়ীর নিয়মিত সুদের টাকা দিতে না পারলে বা তার কাছে টাকা বেশিদিন পড়ে থাকলে তাকে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ দিতে হবে। এতে যদি কেউ ব্যর্থ হন, তাহলে সাক্ষরযুক্ত সাদা স্টাম্প বলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হন দাদন ব্যবসায়ী। এই সময় স্টাম্পে সাক্ষী হিসাবে সাক্ষর করেন অন্যান্য দাদন ব্যবসায়ীগন।

অটো রিকশা, মোটরসাইকেল, ট্রাক্টর মালিকদেরকে গাড়ির মুল কাগজপত্র সাদা স্টাম্পে সাক্ষর নিয়ে ২০-৩০% সুদে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা দেন দাদন ব্যবসায়ী। টাকা পরিশোধে ব্যতিক্রম হলে গাড়ীর মালিকানা দাদন ব্যবসায়ীর হয়ে যায়।পার্টস, সার, বীজ ব্যবসায়ীরা ৩ মাসের জন্য ৫০% সুদে কৃষকদেরকে সেচ পাম্প, শ্যালা মেশিন, সার বীজ দাদন দিয়ে থাকেন।আদিতমারী উপজেলায় ঢাকা টোব্যাকো কোম্পানি কৃষকদের তামাক দেওয়ার শর্তে একর প্রতি ১ বস্তা এসওপি ও ২ বস্তা টিএসপি সার দাদনে অগ্রিম দিচ্ছে।

কৃষকদের দাবী, তামাক বিক্রির সময় তারা ইচ্ছে মত সারের দাম ধরে জোরপূর্বক আদায় করে থাকেন। বিট্রিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানিও একই শর্তে কৃষকদের ব্যাংকের মাধ্যমে এক থেকে দেড় হাজার টাকা দাদনে অগ্রিম দিয়ে থাকে।চক্রবৃদ্ধিহার সুদে দাদন ব্যবসার ফলে একদিকে শুষিত হচ্ছে জেলায় লক্ষাধিক সাধারণ ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষক, বিপদগ্রস্ত জনগণ।

অপর দিকে দিনদিন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ/ টাকার কুমির হচ্ছেন কতিপয় অসাধু দাদন ব্যবসায়ী। তৃণমূলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য খুব দ্রুত দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ বলে আপাময় জনসাধারণ মনে করেন।