ম্যাচ হারার কারণ হিসেবে যে ব্যাখ্যা দাঁড় করালো মিডিয়া

আরিফুর রহমান বাবু : যে দল পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গত চারটি সিরিজে টানা ১২ ম্যাচে একবার মাত্র দু‘শোর নীচে অলআউট হয়েছে, (তাও ভারতের সাথে)- সেই দলটিই কি না আজ বুধবার আফগানিস্তানের সামনে থেমে গেলো ২০৮ রানে!

অথচ ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে এই তামিম, সৌম্য, মুশফিক, সাকিব, মাহমুদউল্লাহ ও সাব্বিরদের সাবলীল উইলোবাজির সামনে ওয়াহাব রিয়াজ, ওমর গুল, জুনায়েদ খান, সাইদ আজমলদের নিয়ে গড়া পাকিস্তানের বোলিং; ভুবনেশ্বর কুমার, উমেষ যাদব, মোহিত শর্মা, রবিচন্দন অশ্বিন ও রবীন্দ্র জাদেজার সাজানো ভারতীয় বোলিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কাইল অ্যাবোট, কাগিসো রাবাদা, ক্রিস মরিস, ইমরান তাহিরের মত বোলাররা হালে পানি পাননি।

ইতিহাস জানাচ্ছে গত বছর এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যে চারটি সিরিজ টানা জিতেছে মাশরাফির দল, তার মধ্যে শুধু একবার ২০০‘র নিচে ইনিংস শেষ হয়েছে টাইগারদের।

দিনটি ছিল ২০১৫ সালের ১০ জুলাই। শেরে বাংলায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিতে ১৬০ রানে (৩৬.৩ ওভার) বাংলাদেশের সবাই আউট হয়ে যান। প্রোটিয়া ফাস্ট বোলার কাগিসো রাবাদার দুর্দান্ত বোলিং তোড়ের মুখে সাকিব আল হাসানই (৪৮ ) কেবল কিছুটা দৃঢ়তা দেখাতে সক্ষম হন।

বাকি সবাই ব্যর্থতার মিছিলে যোগ দেন। প্রোটিয়া ফাস্ট বোলার রাবাদা ১৬ রানে পতন ঘটান ৬ উইকেটের। সেই দল যখন আফগানদের কাছে দুশো’র আশপাশে অলআউট হয়, তখন হিসেব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে বৈ কি।

নানা প্রশ্ন ছুটে আসতে শুরু করে, এটা কোন ব্যাটিং হলো? পিচ কি খুব কঠিন ছিল? আফগান বোলিংয়ের ধারও নিশ্চয়ই খুব বেশি ছিল না, তাই যদি হতো তাহলে অভিষেক হওয়া মোসাদ্দেক আর বোলার রুবেল শেষ উইকেটে ৪৩ রান জুড়ে দিলেন কি করে?

এটা সত্যি আফগান লেগ স্পিনার রশিদ খান বেশ ভাল বল করেছেন। এ আফগানের বল এমনিতেই ঘোরে। আলগা ডেলিভারি কম। লেগ স্পিন ও সোজা ডেলিভারির পাশাপাশি গুগলিও ছুড়তে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা, বল ফেলেন খুব ভাল জায়গায়। ব্যাটসম্যান উইকেটের পাশে শটস খেলার জায়গা কম পান। তাই তার বলে ফ্রি স্ট্রোক প্লে‘ও কঠিন।

তবে ক্রিকেটীয় পরিভাষায় যাকে ‘আনপ্লেয়েবল’ বলে, রশিদ নিশ্চয়ই তা নন। এছাড়া আফগান বোলারদের মধ্যে আর একজন আছেন, যার বল সুইং করে। তিনি মিরওয়াইজ আশরাফ। ২৮ বছর বয়সী এ আফগানের বলে গতি কম। সেটাই পুঁজি। কম গতির ডেলিভারি একটু ওপরের দিকে পিচ ফেলে ছোট্ট সুইং করাতে পারেন, তাই তার বিপক্ষে ফ্রি স্ট্রোক খেলা একটু কঠিন।

এই পেসার যদি উইকেটের সহায়তা পান, মানে পিচ যদি স্লো ও তুলনামূলক লো থাকে- তাহলে তার বলে স্ট্রোক প্লে আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বুধবার আশরাফ সে কারণেই উইকেটই পেয়েছেন।

আজ যে পিচে খেলা হয়েছে, তার গতি, বাউন্স ও চরিত্র প্রথম ম্যাচের মত ছিল না। এ পিচ তুলনামূলক স্লো। বল পিচে পড়ে একটু থেমে ব্যাটে এসেছে। তামিম, সৌম্য আর মুশফিক উইকেটের গতি না ঠাউরে ব্যাট চালাতে গিয়েই বিপদ ডেকে আনেন।

এ উইকেট প্রথম ম্যাচের মত নয়। এখানে ২৭০ কিংবা তার বেশি করা কঠিন। এটা আসলে ২৩০/২৪০‘এর উইকেট। পিচ একটু স্লো বল পিচ পড়ে খানিক থেমে ব্যাটে আসবে। এখানে ফ্রি স্ট্রোক খেলা একটু কষ্টসাধ্য। চার-ছক্কা, তথা বিগ হিটে কম গিয়ে সিঙ্গেলস-ডাবলসে খেলে আলগা ডেলিভারির অপেক্ষায় থাকাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

নিশ্চয়ই তামিম, সৌম্য, মুশফিক ও সাকিবের তা ভালই জানা; কিন্তু জানা অংক ভুল করার মত, তারা জায়গামত সঠিক ব্যাটিং কৌশল প্রয়োগ করতে পারেননি। আসল বিপত্তিটা ঘটেছে সেখানেই। অথচ দুজনই সেট হয়ে গিয়েছিলেন। একটু রয়ে সয়ে আলগা বলের অপেক্ষায় থাকলেই হয়ত বড় ইনিংস খেলতে পারতেন।

দুই বাঁ-হাতি ওপেনারই অফস্ট্যাম্পের বাইরে চটকদার শটস খেলতে পছন্দ করেন, তা জেনেই তামিম, সৌম্যর বিরুদ্ধে অফস্ট্যাম্পের আশ-পাশে ওপরের দিকে বল ফেলে সমীহ আদায় করেন নেন আশরাফ।

দুই ওপনারই হন তার শিকার। অফ স্ট্যাম্পের বাইরে একটু থেমে আসা ডেলিভারিকে অনসাইডে বিগ হিটের চেষ্টা করেন তামিম। একটু দেরিতে আসা বল তার ব্যাটের বাইরের কোনা ছুঁয়ে চলে যায় থার্ডম্যানে। ব্যাটের বাইরের কোনায় লেগে থার্ডম্যানে ক্যাচ চলে যায়।

সৌম্যও ছটফট করছিলেন। তাই উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে মারতে গিয়ে আউট হলেন। এ বাঁ-হাতিকে উইকেটে ছেড়ে বেরিয়ে আসতে দেখে লেন্থ বদলে একটু শর্ট করে দেন। সৌম্য তাই বলের পিছনে যেতে পারেননি। দুর থেকে নেয়া শট চলে যায় উঁচু হয়ে কভারে।

দুই ওপেনারের চেয়ে ভাল খেলছিলেন মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকুর রহীম। জুটিও জমে উঠেছিল; কিন্তু দুজনই উইকেট থ্রো করে আসেন। সবচেয়ে দৃষ্টিকটু ঠেকেছে মাহমুদউল্লাহর আউট। পেসার নাভিন উল হকের ফুললেন্থ ডেলিভারিকে জায়গায় দাড়িয়ে ক্রস ব্যাটে চালাতে গিয়ে বোল্ড হলেন তিনি।

আর বড় ইনিংস সাজানোর পথে অনেকদুর এগিয়ে যাওয়া মুশফিক উইকেটে বল থেমে আসতে দেখেও সুইপ শট খেলার লোভ সামলাতে পারেননি। একটু স্লো ট্র্যাকে সুইপ খেলা ঝুঁকিপূর্ণ। এটা ভালই জানা তার। তবুও কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলা?

শুধু মুশফিকের কথা বলা কেন, সাকিব-সাব্বিরও ঠিক মত নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। দু’জনই লেগবিফোর উইকেটের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছেন। বাঁ-হাতি সাকিবকে বুদ্ধি খাটিয়ে সোজা বলে আউট করেছেন অফস্পিনার মোহাম্মদ নবি।

আর লেগি রশিদের বলে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে পা দিয়েছেন সাব্বির। বড়রা ভুল পথে হাঁটলেও অভিষেক হওয়া মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ঠিকই ঠান্ডা মাথায় উইকেটের চরিত্র বুঝে সিঙ্গেলস-ডাবলসে খেলে, তারপর একসময় খোলস ছেড়ে বেরিয়ে হাত খুলে খেলেছেন। তাই তার ব্যাট থেকে শেষ পর্যন্ত বল সমান ৪৫ রানের হার না মানা ইনিংস বেরিয়ে আসের্।

একজন সঙ্গী না থাকার পরও ৭ নম্বরে নেমে যখন এমন ইনিংস সাজানো যায়, সেখানে ওপরের দিকে এক বা দুজন এমন দায়িত্ব নিয়ে উইকেটের চরিত্র বুঝে রয়ে সয়ে খেললে রান ঠিক ২৪০‘র আশাপাশে যেত।

উইকেট যে স্লো তার প্রমাণ এবার আর তাসকিন ম্যাজিক নয়, আফগান ইনিংসের প্রথম চারটি উইকেটই তুলে নিয়েছেন বাংলাদেশের স্পিনাররা।-জাগো নিউজ