টেস্ট ক্রিকেটে ১৯ আর ৩৮ বছর বয়সীর পার্থক্য

বয়স হচ্ছে স্রেফ একটা সংখ্যা। বয়স যতই হোক না কেন, ক্রিকেট মাঠে নামার পর সেটাতে আদতে খুব একটা কিছু যায় আসে না।

বাংলাদেশ সফরের জন্য ঘোষিত ইংল্যান্ডের বর্তমান দলটি সম্পর্কে নিন্দুকদের অভিযোগ, দলে কেউ একেবারেই নতুন, আবার কেউ ‘অত্যন্ত বয়স্ক’। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বিতর্ক মূলত ৩৮ বছর বয়সী অভিজ্ঞ অফ স্পিনার গ্যারেথ ব্যাটি আর ১৯ বছর বয়সী দারুন সম্ভাবনাময় নবাগত ওপেনার হাসিব হামিদকে নিয়ে। অ্যালিস্টার কুকের ব্যাটিং সঙ্গী হিসেবে একটু তাড়াতাড়িই তাঁকে খেলতে নামিয়ে দেওয়া উচিত হচ্ছে কিনা, এ প্রশ্নের জবাবে কোচ ট্রেভর বেলিস বলে দিয়েছেন, ‘ও যদি যথেষ্ট ভালো হয়ে থাকে, তাহলে সে এখনই মাঠে নামতে পারবে।’

১৯ বছর কিছুটা কম বয়স হলেও এতটাও কিন্তু নয়। পাকিস্তানের হাসান রাজা যখন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তাঁর অভিষেক টেস্টে খেলতে নামেন, তখন তাঁর বয়স ছিলো মাত্র ১৪ বছর। ব্রাজিলের হয়ে পেলে যখন প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নামেন, তখন তিনি ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর। ১৮ বছর বয়সে মোহাম্মদ আলী জিতেছিলেন অলিম্পিক স্বর্ণপদক। তাছাড়া পল হার্ডক্যাসলের বিখ্যাত গান ‘নাইনটিন’-কে যদি রেফারেন্স হিসেবে ধরা হয়, তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে সম্মুখ যোদ্ধাদের গড় বয়স ছিল ঠিক ১৯ বছর!

বস্তুত, বয়স তাই শুধুই একটা সংখ্যা এবং জীবনযাপনের ধরনের উপরই মূলত কোনো ব্যক্তির পরিণতিবোধ এবং চরিত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব। ‘অলআউট ক্রিকেট’-এর পল ওয়াকারের সাথে কথা বলতে বলতে হাসিব বলে ফেলেছিলেন, নির্বাচকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তিনি এখনই টেস্ট ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত কিনা। আর প্রত্যুত্তরে হাসিব বলেছিলেন, অবশ্যই তিনি প্রস্তুত। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমি নিজে যদি বিশ্বাস না করি যে আমি প্রস্তুত, তাহলে অন্যরা আর সেটা বিশ্বাস করবে কীভাবে?’ কাউন্টি পরিসংখ্যান আর ল্যাংকাশায়ারের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ইয়র্কশায়ারের বিপক্ষে টানা দুই সেঞ্চুরি তাঁকে নির্বাচকদের সুনজরে আনে। ব্যাটিং তিনি যে ভালোই পারেন, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার শিল্ড বেরি’র মন্তব্য অনুসারে, দলে ডাক পাওয়ার পিছনে

সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ ক্রিকেট মাঠে তাঁর কিশোরসুলভ প্রাণোচ্ছ্বলতা, অথচ বিপর্যয়ের মুখে অসাধারণ ক্ষুরধার ক্রিকেট মস্তিষ্ক ব্যবহারের সহজাত প্রতিভা।

সিনিয়র ক্রিকেটে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতাটা আমার জন্য অবিস্মরণীয় এক স্মৃতি। আমার বয়স তখন মাত্র ১৩, আমাদের পার্কের পিচেই খেলা ছিল বার্কবি ইউনাইটেড সেকেন্ডসের সাথে বারস্টল ভিলেজের। হঠাৎ ঐ বুধবারেই অধিনায়ক আমাকে ফোন দিয়ে বলেন  – ‘খেলতে হবে।’

এরপর সপ্তাহের বাকি দিনগুলো যে কী প্রচন্ড উত্তেজনা আর টেনশনে কেটেছে!

ধরেই নিয়েছিলাম, আমি বোলিং পাবোই না আর ব্যাটিংও করবো ১১ নাম্বারে। এক ঝাঁক ছোকড়ায় ভরা চেঞ্জিং রুমে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, সবাই গালিগালাজ, বিয়ার আর মেয়েদের নিয়ে গালভরা গল্প নিয়েই ব্যস্ত, আর সাথে হয়তো কিছুটা ক্রিকেটও ছিল! আবেগ যতই সীমিত থাকুক না কেন, এমনকি ১৩ বছর বয়সেও, যখন আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বড় হয়ে যেতে চাইবেন, আপনি অবশ্যই চাইবেন সবাইকে মুগ্ধ করতে, সেরাদের একজন হয়ে উঠতে। হঠাৎ আম্পায়ার হিসেবে যখন আমার নাম ঘোষণা করা হলো, আমি যেন কিছুটা কেঁপে উঠলাম। কই, জুনিয়র ক্রিকেটে তো কখনো এমন হয়নি! অধিনায়ক বললেন, ‘যাও, ওখানে গিয়ে দাঁড়াও। আর হ্যা, আবার আঙুল উঁচিয়ে আউট দিলে খবর আছে!’

আম্পায়ারদের সুবিশাল মাস্তুলসদৃশ কোটের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ভাবছিলাম, ‘স্ট্যাম্পের দিকে বল আর না গেলেই হয়! তাহলেই আর লেগ বিফোর উইকেট দেওয়া লাগবে না, বেঁচে গেলাম!’

হঠাৎ একটা উইকেট পড়ে গেল, ক্রিজে এলেন আমাদের অধিনায়ক। তাঁকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম আমি, অস্বচ্ছন্দ্য এবং নার্ভাস হয়ে ক্রিজে এলেন, পড়িমড়ি করে সুইসাইডাল রান নিতে গেলেন, পড়ে গিয়ে মাটিতে লুটোপুটি খেয়ে শেষমেষ হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে ক্রিজে এসে ঢুকলেন। কিন্তু ওদিকে বেরসিক ফিল্ডাররা ততক্ষণে বল থ্রো করে স্ট্যাম্পের বেল ফেলে দিয়ে চিৎকার করে আবেদন করলো। আমিও ঘাড়ত্যাড়ার মত টেনশনে জমে যাওয়া হাত দুটো শক্ত করে ঐ বিশাল পকেটের মধ্যে গুঁজে রেখে দিলাম, নট আউট!

বোলার আমাকে দিব্যি দিয়ে কথা বললেও আমি বিন্দুমাত্র নড়িনি সিদ্ধান্ত থেকে, পরে প্যাভিলিয়নে ফিরে অধিনায়কের বেশ কিছু প্রশংসাও জুটেছিল কপালে। যতদূর মনে পড়ে, একজন তরুণকে বরণ করে নেওয়ার মত বিবেচনাবোধসম্পন্ন অগ্রজদের কেউ একজন সম্ভবত আমাকে একটা শ্যান্ডিও দিয়েছিল!

এই শীতে গ্যারেথ বেটি হয়ে উঠতে পারেন এমন একজন ‘ফাদারলি ফিগার’, যিনি আদতেই হাসিব হামিদের বাবার বয়সীই বলা চলে। ব্যাপারটা এমন নয় যে তিনি নবাগতদের কোচিং করাতেই এসেছেন সফরে। এ বছর ওভালে তাঁকে খেলতে দেখেছি এবং ক্রিকেট বলের সাথে তাঁর সখ্যতার প্রমাণ দেখেছি। তাঁর মধ্যে একই সাথে আগ্রাসী মনোভাব আর মারকাটারি ব্যাটসম্যানদেরও আঁটসাঁট বোলিং-এ বেঁধে রাখার ক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, টেস্ট ক্রিকেটে রান চাপিয়ে রাখাটা আসলেই কি যথেষ্ট? আর ধরেই নিলাম যে তিনি বেশ কিছু উইকেট তুলেও নিলেন, কিন্তু নির্বাচকদের চোখ কি আরো কিছুটা দূরে থাকা উচিত নয়? পারফরম্যান্সের কথা বাদ দিন, তাঁর বয়স সামনেই হয়ে যাবে ৩৯। এই বয়সে তিনি যদি ভবিষ্যৎ ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে খেলার সুযোগ পেয়ে যান, তাতেই তাঁকে সৌভাগ্যবান ধরে নেওয়া উচিত! পাকিস্তানের প্রেসআপ চ্যাম্পিয়ন মিসবাহ-উল-হককে এই কথা বলে দেখুন তো, ৪২ বছর বয়সেও দুর্দান্ত ফিট অবস্থায় খেলে যাচ্ছেন!

মাঠে কে কি করতে পারছে, সেটাই হচ্ছে মূল ব্যাপার। সেটা যেমন বেটি করে দেখিয়েছেন, তেমনি করে দেখিয়েছেন হাসিবও। যদিও বয়স খুবই কম, তবে মনে রাখা দরকার যে শচীন টেন্ডুলকারের অভিষেক হয়েছিল তাঁর চেয়েও তিন বছর কম বয়সে। ওহ, এই লেখাটা লিখতে লিখতেই মনে পড়লো, গত সপ্তাহেই আমি একটা ‘ফ্রেন্ডলি ম্যাচ’ খেলেছিলাম, যাতে দুই বাপ-বেটা ওপেনার হয়ে খেলতে নেমে গেছিলো! দারুণ মেধাবী ১৬ বছর বয়েসী ওই ছেলেকে আমি জিজ্ঞেস করলাম,এটাই সিনিয়র লেভেলে খেলা তাঁর প্রথম ম্যাচ কিনা। ছেলেটা আমাকে উত্তর দিল, ‘আমি তো বেশ কয়েক বছর ধরেই খেলে আসছি!’

আমি অবাক হয়ে গেলাম, ‘বেশ কয়েক বছর মানে?’ আমাকে স্তব্ধ করে দিয়ে ও বললো, ‘আমার যখন প্রথম ম্যাচ আমি খেলেছিলাম, যখন আমার বয়স আট। আর আমি দ্বিতীয় বলেই চার মেরেছিলাম কিন্তু!’

এজন্যই তো আগে বললাম – ‘আপনি যদি যথেষ্ট ভাল মানেই আপনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ!’

– ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে প্রকাশিত নিকোলাস হগের The difference between 19 and 38 years old in Test cricket অবলম্বনে।-খেলাধুলা