‘চোখের সামনে আত্মীয়কে খুন বা ধর্ষণ করলে, ট্রমা হওয়া স্বাভাবিক’: সোহা

শিবাজি লোটন পাতিল পরিচালিত ‘৩১ অক্টোবর’ ছবির প্রেক্ষাপট ১৯৮৪-এর শিখ রায়ট। সেই ছবির অভিজ্ঞতা সোহা আলি খান শেয়ের করলেন-

• ১৯৮৪-এর শিখ দাঙ্গা সময়ে আপনি খুবই ছোট ছিলেন। সেই সময়ের কোনও অভিজ্ঞতা যদি শেয়ার করেন…

সোহা: সেই সময়ে আমার বয়স সত্যিই খুব কম ছিল। ১৯৮৪-এর অক্টোবরে আমরা মুম্বই থেকে দিল্লি চলে গিয়েছিলাম। সেই সময়ে আমার বাবার মা খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমার মনে পড়ে, সেই সময়ে এই নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। একজন সর্দারজি ছিলেন, যিনি আমাদের সঙ্গে কাজ করতেন। তিনিও তখন আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। তার পর বাবা তাঁকে ফিরে যেতে বলেন। ফেরার পথে তিনি আক্রান্ত হন। হয়তো মারাও যেতে পারতেন।

তিনি প্রায় মারাই পড়ছিলেন, কিন্তু বুদ্ধি করে নিজের চুল কেটে ফেলেছিলেন। আমার মনে হয়, তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা বাবা একেবারে সঠিক নিয়েছিলেন। আমার মনে পড়ে আমার মা-বাবা আমাকে বলেছিলেন, পটৌডিতে প্রায় ১৩ থেকে ১৫টি শিখ পরিবার রয়েছে। ১৯৮৪-তে প্রতিটি পরিবারের প্রধানকে খুন করা হয়েছিল। তাঁদের কেউ কেউ একটা আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে ধাওয়া করে তাঁদের হত্যা করা হয়। অনেকেই পরে দেশ ছেড়ে চলেও গিয়েছিলেন। খুবই ভয়ের স্মৃতি।
• ‘৩১ অক্টোবর’ থবিতে আপনার চরিত্রের বিষয়ে কিছু বলুন…

সোহা: ছবিতে আমার চরিত্রের নাম তজিন্দর কউর। সে একাধারে একজন মা এবং স্ত্রী। তার তিনটি সন্তান রয়েছে। সে দিল্লির একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্মরত মহিলা। সে তার পরিবারের দেখভাল করে সঙ্গে চাকরিও করে। সেই সময়ে শিখ রায়ট একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। ছবিতে ইন্দিরা গাঁধীর হত্যার ঘটনাটি নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

• গণহত্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাইকোলজিক্যাল ট্রমা সম্পর্কে আপনার কী বক্তব্য?

সোহা: চোখের সামনে আপনার প্রিয়জনের প্রতি এমন বিধ্বংসী গণহত্যা প্রত্যক্ষ করা খুবই কষ্টকর। ইদানীং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ‘জেনোসাইড’ টার্মটি ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণত চোখের সামনে ঘটে যাওয়া যে কোনও জুলুম, যেখানে আপনার নিকট আত্মীয়কে যদি খুন, ধর্ষণ বা অত্যাচার করা হয়, তাহলে সেইক্ষেত্রে সাইকোলজিক্যাল ট্রমা হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

• জেনোসাইড-এর পিছনে ক্রিয়াশীল মানসিকতা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

সোহা: আমি মনে করি, সকল মানুষ আদপেই ভাল। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও এমন গণহত্যার বেশকিছু উদাহরণ সাম্প্রতিক কালেও দেখা যায়। আজও মানুষের উপর চরম নির্যাতন চালানো হয়। কোনও ধর্ম গণহত্যা প্রচার করে না। বিষয়টি সর্বদা রাজনৈতিক ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদেরই তৈরি করা।

• ১৯৮৪-এর শিখ দাঙ্গার সময়ে রাজীব গাঁধীর বিখ্যাত উক্তি ছিল— ‘যখন একটা বড় গাছ ভেঙে পড়ে তখন পৃথিবীও কেঁপে ওঠে’— এই সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

সোহা: এই ছবিটি রাজনৈতিক কচকচানি থেকে অনেকটাই দুরে। এটি রাজীব গাঁধী বা কংগ্রেস দলকে নিয়ে নয়। তাই, এইসমস্ত বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। ছবিটি মূলত করা হয়েছে সেইসব দর্শকদের জন্য, যাঁরা জানেন না ১৯৮৪ সালে ঠিক কী হয়েছিল। এবং সবচেয়ে আগে এই ছবি মানুষকে সেই রায়ট সম্পর্কে নূন্যতম আভাস দিতে চাইছে, যে সেই বছরে ঠিক কী হয়েছিল? যাঁরা সেইসময়ে জীবিত ছিলেন তাঁদের জন্য এই ছবি দারুণ আবেগপূর্ণ অভিজ্ঞতা। ছবির গল্প ভীষণই সংবেদনশীল। তবে এর মাধ্যমে কিছু পুরোনো ঘটনা আবার সামনে চলে আসবে, যা বিতর্ক তুলতে পারে।

•  আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ অনাথ পশুদের দত্তক নেওয়ার জন্য। আপনি এবং আপনার স্বামীর এই পশুকল্যাণ বিষয়টিতে কেন্দ্র করে কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?

সোহা:  আমরা বর্তমানে একটি অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। আমরা ‘ওয়ার্ল্ড ফর অল’ নামে একটি এনজিও-এর সঙ্গে কাজ করি। মুম্বই শহরে তাঁরা খুব ভাল কাজ করছছেন। পশুদের উদ্ধার করা, তাঁদের দত্তক নেওয়া এবং তাঁদের ভ্যাকসিনেশন দেওয়ার মতো যাবতীয় কাজ করে থাকে এই সংস্থা। এদের মাধ্যমে আমরা কিছু পোষ্য দত্তকও নিয়েছি। আমরা মনে হয় এইসব অবলা জীবরা আর কিছু দিতে পারুক না পারুক, নিঃস্বার্থ ভালবাসা দিতে পারে। তারা কখনও কারোকে ইচ্ছাকৃত আঘাত করে না। আমার মনে হয়, কিছু মানুষ পশুদের সঙ্গে খুবই খারাপ আচরণ করে…

•  একটি সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, আপনি মনে করেন আপনি খুব ভাল বাংলা বলতে পারেন না, কিন্তু বাংলায় কাজ করেছেন। এখন কি আপনার বাংলা আগের থেকে সহজ হয়েছে? আপনি কি বাংলা বুঝতে পারেন? বাংলা সংস্কৃতির কোন কোন বিষয় আপনার পছন্দ?

সোহা:  হ্যাঁ, আমার বাংলা অনেকটাই ভাল হয়েছে। অনেকদিন যাবৎ আমি কোনও বাংলা ছবি করিনি। তবে আমি আরও বাংলা ছবি করতে পছন্দ করব। আমি বাংলা বুঝতে পারি, তবে খুব ভাল বলতে পারি না। বাংলার সংস্কৃতির বহু জিনিস আমি পছন্দ করি। প্রত্যেকবার যথনই আমি কলকাতায় আসি, আমার একটি জিনিসই ভাল লাগে যে, কলকাতাবাসীরা সবসময়ই নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে খুবই গর্বিত। তবে আমার একটা আফসোস রয়েছে, এই বছর আমি দুর্গাপুজোয় কলকাতায় থাকতে পারব না। কিন্তু দুর্গাপুজোর সময়ে প্রত্যেক বছরই আমি কলকাতায় যাই। এই বছর আমার ছবির মুক্তির জন্য কলকাতায় থাকতে পারব না।

• আপনার মায়ের অভিনীত কোন কোন বাংলা ছবি আপনার পছন্দের?

সোহা: ‘দেবী’ আমার অত্যন্ত পছন্দের একটি ছবি। কারণ, এতে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা রয়েছে। আমার মা নিজেই বলেছেন, যখন এই ছবিটিতে তিনি অভিনয় করেছেন, তখন তাঁর বয়স খুবই কম ছিল এবং বিষয়টি বোঝার মতো বুদ্ধিও তাঁর ছিল না। তবে সত্যজিৎ রায় অসাধারণ ক্ষমতাবলে তাঁর অভিনেতাদের কাছ থেকে সেরাটা আদায় করে নিতে পারতেন। এছাড়াও ‘নায়ক’, ‘অপুর সংসার’ এবং ‘দেবী ’আমার খুবই পছন্দের সিনেমা।

• ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে আপনাদের পরিবারের একটি বংশগত যোগ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন কোন কাজ আপনার ভাল লাগে?

সোহা: রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প আমার খুবই পছন্দের। আমি ‘গীতাঞ্জলি’ পড়েছি। তাঁর সৃষ্টির বিপুল ভাণ্ডার থেকে কোনগুলি পছন্দের, তা বলা খুবই কঠিন। তবে তাঁর ছোটগল্পগুলি আমার খুবই পছন্দের।

• আপনার ননদ করিনা মা হতে চলেছেন। এ নিয়ে আপনারা পরিবারের সকলে কতখানি আনন্দিত? আপনার পরিবারের এই বিষয়টি নিয়ে কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?

সোহা: হ্যাঁ অবশ্যই উত্তেজিত। তবে সেই অর্থে কোনও পরিকল্পনা নেই। আমি ঠিক জানি না, যেভাবে অন্যান্য পরিবারে পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে, সোয়েটার বোনা হয়। ডিসেম্বর এগিয়ে আসছে এবং আমি খুবই উত্তেজিত। –এবেলা