গুলিতে উড়ল পা, তবু সেনা শিবিরে বার্তা পৌঁছে দিল ‘শের আমি’!

সৃষ্টি বড়ই অদ্ভূত। পৃথিবী জুড়ে এমন অনেক কিছুই রয়েছে, যেগুলি সম্পর্কে ন্যূনতম কোনও ধারণাই আমাদের নেই। বেশি দূরে যেতে হবে না। ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’ই যে কত সৃষ্টি, কত ঘটনা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তা-ই অনেক সময় আমাদের গোচরে আসে না।

এধরনের অজানা-অচেনার খোঁজে আমাদের যাত্রা চলছে। এই সফরে প্রতি রবিবার আমরা ধারাবাহিকভাবে এমন কিছু তথ্য তুলে ধরি, যা শুনে তাজ্জব হতে হয়। সম্প্রতি পায়রার পায়ে বেঁধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে হুমকি চিঠি পাঠানোর সংবাদ পাওয়া গিয়েছে। সেই সূত্রে দেখে নেওয়া যাক এমন কিছু অবাক করা কাজ, যা এই পর্যন্ত শুধুমাত্র পায়রার পক্ষেই করা সম্ভব হয়েছে।

১) বার্তা বহনকারী

খৃস্টপূর্বাব্দ পঞ্চম শতকে সিরিয়া ও পারস্যে পায়রার মাধ্যমে খবর আদানপ্রদান করার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এর বহুকাল পরে, দ্বাদশ খৃস্টাব্দে বাগদাদ এবং সিরিয়া ও মিশরের বেশ কিছু শহরে খবর চালাচালির জন্য পায়রা ব্যবহার করা হত। রোম সাম্রাজ্যে পায়রাকে ব্যবহার করা হত মূলত অলিম্পিকের মতো বিখ্যাত ক্রীড়ানুষ্ঠানের খবর পৌঁছে দিতে। প্রাচীন এই প্রথা মেনে এখনও অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাদা পায়রার ঝাঁক উড়িয়ে দেওয়ার রীতি বহাল রয়েছে। পাশাপাশি, শান্তির প্রতীক হিসেবেও সাদা পায়রা ওড়ানোর রীতি রয়েছে।

২) পায়রা ডাক ১৮৯৬ সালে নিউ জিল্যান্ড এবং গ্রেট ব্যারিয়ার দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে চালু হয় বিশ্বের প্রথম সরকারি পিজিয়ন এয়ারমেল সার্ভিস। এই পরিষেবার পিছনে রয়েছে গ্রেট ব্যারিয়ার উপকূলে যাত্রীবাহী জাহাজ এস এস ওয়াইরারাপার সলিল সমাধি। ওই দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন প্রাণ হারান। জানা যায়, দুর্ঘটনার তিন দিন পরে নিউ জিল্যান্ডে জাহাজডুবির খবর পৌঁছয়। ফলে দুর্গতদের উদ্ধারের জন্য কোনও ত্রাণ পাঠানো সম্ভব হয়নি। এর পরেই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে পায়রা ডাক ব্যবস্থা চালু করা হয়। গ্রেট ব্যারিয়ার দ্বীপপুঞ্জ থেকে পায়রার পায়ে বাঁধা বার্তা নিউ জিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহরে পৌঁছতে সময় নিত মাত্র ১.৭৫ ঘণ্টা। প্রতিটি পায়রা একসঙ্গে ৫টি বার্তা বইতে সক্ষম ছিল। মাত্র ৫০ মিনিটে খবর পৌঁছে দিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল ‘ভেলোসিটি’ নামের এক পায়রা ডাক হরকরা। এই বিশেষ ডাক ব্যবস্থার জন্য ব্যবহার করা হত বিশেষ ডাক টিকিট।

৩) যুদ্ধবীর কবুতর যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বয়ে এনে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে পায়রারা। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শত্রু বাহিনীর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বার্তা পৌঁছনোয় পায়রাদের জুড়ি ছিল না। রণতরীতে মজুদ থাকত বিশেষ পায়রাবাহিনী। শত্রুর আক্রমণে মাঝসমুদ্রে জাহাজ বিপদে পড়লে, সঠিক অবস্থান এবং বিপদের বিস্তারিত তথ্য লিখে পায়রার পায়ে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হত। সেই বার্তা পেয়ে ডুবন্ত জাহাজের যাত্রীদের উদ্ধার করা হত। শুধু তাই নয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈন্যদের ট্রেঞ্চের পিছনে খাঁচায় পায়রা রাখার রীতি ছিল। শত্রুসেনারল গোলাগুলি ও বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী এড়িয়ে যথা সময়ে সঠিক ঠিকানায় বার্তা পৌঁছে দিত এই পায়রার দল। এছাড়া, শত্রু শিবিরের হালচাল জানতে গোয়েন্দা হিসেবেও পায়রাদের মোতায়েন করা হত। এই কাজে মাত্র ১০% পায়রা বেঁচে ফিরত বলে জানা যায়।

৪) পায়রা বীর যুদ্ধক্ষেত্রে অসামান্য কীর্তি গড়েছে বেশ কয়েকটি পায়রা, যাদের নাম ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে। এমনই এক পায়রা ছিল ফরাসি সেনাবাহিনীর সদস্য শের আমি, যে নামের অর্থ ‘প্রিয় বন্ধু)’। যুদ্ধ-বিদীর্ণ আকাশে বার্তা বয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তার বুকে শত্রুপক্ষের গুলি লাগে। বার্তা-বাঁধা পায়ের বেশির ভাগই উড়ে যায়। তবু না-থেমে টানা ২৫ মিনিট উড়ে চলে সঠিক ঠিকানায় বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল শের আমি। বীরত্বের এই বিরল প্রদর্শনের পুরস্কার হিসেবে শের আমিকে ‘ক্রয়েস দ্যে গ্যুয়ের’ পদক প্রদান করা হয়। শের আমি-র মতোই বীরত্বের আর এক নজির গড়েছিল যুদ্ধবীর জি আই জো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ইতালির এমন এক শহরের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা মিত্রশক্তির বোমারু বিমান গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।

বিমানহানা রুখতে দ্রুত বার্তা পৌঁছনোর প্রয়োজন দেখা দেয়। এদিকে বার্তা পাঠানোর যন্ত্রপাতি ঠিক সেই সময়েই বিকল হয়ে পড়ে। উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত তড়িঘড়ি কাগজে বার্তা লিখে তা জি আই জো-র পায়ে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হয়। মাত্র ২০ মিনিটে ২০ মাইল উড়ে গিয়ে মিত্রশক্তির প্রধান দপ্তরে সেই জরুরী বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল জো। রানওয়েতে তখন সবে দৌড় শুরু করেছে বোমারু বিমানের ঝাঁক। জি আই জোয়ের অসামান্য সাহসের সুবাদে মাত্র ৫ মিনিটের ব্যবধানে ধ্বংসলীলার হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন ইতালির সেই শহরের বাসিন্দারা। এই কীর্তির জন্য ‘ডিকিন’ পদকে ভূষিত করা হয় জি আই জো-কে।

৫) পায়রার বুদ্ধিমত্তা মগজের নিরিখে পাখিদের মধ্যে শীর্ষ স্থান দখল করেছে পায়রারা। মানুষ ও বাঁদর শ্রেণিভুক্ত প্রাণীদের মতোই বুদ্ধি ধরে তারা। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পায়রাই একমাত্র পাখি যে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি চিনতে সক্ষম। ইংরেজি বর্ণমালার ২৬টি অক্ষর দেখে শুধু চিনতে পারাই নয়, তা মুখস্থ করতেও ওস্তাদ পায়রা। শুধু তাই নয়, ফোটোগ্রাফ দেখে দুইজন মানুষের মধ্যে ফারাকও সে অনায়াসে করতে পারে। মস্তিষ্কের এমন দাপট পাখি তো ছার, বেশির ভাগ প্রাণীর পক্ষেই অসম্ভব। — ইন্ডিয়ান টাইমস