অভিশাপই কৃষকদের আর্শিবাদ

জোয়ারের পানিতে ভাসছে, আর ভাটায় জেগে উঠছে। কৃষকরা বলেন, ‘ভাসমান’ বা ‘কচুরিপানার ধাপ’ পদ্ধতি। তবে মাটি ছাড়া পানিতে চাষাবাদের কেতাবি নাম ‘হাইড্রোপনিক পদ্ধতি’। বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে প্রায় ৬০ বছর যাবত সবজি চাষ করছেন কৃষকরা। বর্ষায় এসব এলাকার শত শত একর নিচু জমি পানি বন্দি থাকে। তাই বলে হাত গুটিয়ে তো বসে থাকা যায় না। কৃষকরা দিনের পর দিন দেখে, শুনে, বুঝে ‘ভাসমান’ বা ‘কচুরিপানার ধাপ’ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। জলাবদ্ধতার অভিশাপ পরিণত হলো আশীর্বাদে। ধারণা করা হয় পদ্ধতিটি প্রথম বের করেন নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটার কৃষকরা।

সেখানেই শুরু হয় ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ। উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের শিবপুর,রাজাপুর,উত্তর শিবপুর,নয়াকান্দি,পটিবাড়ী,উত্তর সাতলাসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন ধানি জমি বাংলা বছরের আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত সাত থেকে আট ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। তাই এ সময় এখানকার মানুষ বেকার হয়ে পড়েন। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম বছরে প্রায় সাত থেকে আট মাস জলাবদ্ধ থাকে। শিবপুর এলাকার সফল চাষী হালিম বেপারী জানান, জলাবদ্ধতার সময় পানিতে জন্ম নেওয়া জলজ উদ্ভিদ, কচুরিপানা, শ্যাওলা, দুলালীলতা ভাসমান পদ্ধতিতে তৈরি জৈবসার এ পদ্ধতির প্রধান উপকরণ।

আষাঢ় মাসে কচুরিপানা সংগ্রহ করে স্তূপ করা হয়। জলাভূমিতে প্রথমে কচুরিপানা এবং পর্যায়ক্রমে শ্যাওলা, কচুরিপানা ও দুলালীলতা স্তরে স্তরে সাজিয়ে দুই ফুট পুরু ধাপ বা ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হয়। একেকটি ভাসমান ধাপ ৫০-৬০ মিটার দীর্ঘ ও দেড় মিটার প্রশস্ত হয়। সেসব ধাপ দ্রুত পচানোর জন্যও সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। ‘ভাসমান’ বা ধাপ পদ্ধতিতে সরাসরি বীজ বপন সম্ভব না হওয়ায় কৃষকরা প্রতিটি বীজের জন্য এক ধরনের আধার তৈরি করেন। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন ‘দৌল্লা’। এক মুঠো করে টেপাপানা (ছোট কচুরিপানা), দুলালীলতার মধ্যে নারিকেল ছোবড়ার গুঁড়া দিয়ে তৈরি করা হয় দৌল্লা।

শুধু নারীরাই ‘দৌল্লা’ তৈরির কাজ করেন। দৌল্লার মধ্যে বিভিন্ন সবজির অঙ্কুরিত বীজ পুঁতে মাচানে বা শুকনো জায়গায় রাখা হয়। এর আগে ভেজা জায়গায় বীজ অঙ্কুরিত করা হয়। দৌল্লাগুলো এভাবে তিন থেকে সাত দিন সারি করে রাখা হয়। ধাপে স্থানান্তরের পাঁচ-ছয় দিন পর গজানো চারার পরিচর্যা শুরু হয়। পাঁচ-ছয় দিন পর পর ‘ভাসমান’ ধাপের নিচের কচুরিপানার মূল বা শ্যাওলা দৌল্লার গোড়ায় বিছিয়ে দেওয়া হয়। এভাবেই বীজ থেকে লাউ, কুমড়া, করলা, ঝিঙে, শিম, বরবটি, পেঁপে, বেগুন, বাঁধাকপি, টমেটো ও শসার চারা উৎপাদন করা হয়।

শাক-সবজি বড় হলে ধাপ থেকে তুলে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন। রাজাপুর এলাকার মোজাম্মেল হক ও শিবপুর এলাকার সুশীল বাড়ৈ জানায়, সাধারনত এসব ধাপের মেয়াদকাল তিন মাস। কিন্তু অঙ্কুর থেকে চারায় পরিণত হয় মাত্র ২০ থেকে ২২ দিনে। যে কারণে ধাপগুলো পুনরায় ব্যবহার করার জন্য সামান্য পরিবর্তন করতে হয়। তখন ৫০ মিটারের একটি ধাপের জন্য ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়।

পুনরায় ধাপ প্রস্তুত না করে প্রথমবার ব্যবহৃত ধাপ আবার অন্য কৃষকের কাছে বিক্রিও করে দেওয়া যায়, যা আমরা প্রায় সময়ই করে থাকি। উত্তর শিবপুর এলাকার সোহেল হাওলাদার জানান, প্রথমবার ব্যবহৃত ধাপ বিক্রি হয় দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকায়। প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিটারের একটি সারি, দল বা ধাপ তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। এ সবজি চাষ করে একজন কৃষক তিন মাসে প্রায় লক্ষাধিক টাকা লাভ করে থাকেন। তিনি আরও জানান, তারা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের আওতাধীন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট,পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয়ের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের সাহায্য সহযোগীতার মাধ্যমে এ বছর তারা চাষ করছেন।

ওই প্রকল্পটির সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ও উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওই প্রকল্পের আওতায় উপজেলার একটি মাত্র ইউনিয়ন সাতলায় প্রায় ৮ শত কৃষক ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছেন। তারা ওই সকল চাষীদের বীজ দেয়া থেকে শুরু করে ফসল বিক্রির পূর্ব পর্যন্ত যেসব সরঞ্জামাদি প্রয়োজন তা দিয়ে সহায়তা করে থাকেন এবং বীজ রোপন থেকে ফসল বিক্রি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এগুলো পর্যবেক্ষন করেন। তবে এ চাষ নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাকির হোসেন তালুকদার জানিয়েছেন, ঝড় ও জলোচ্ছ্ব্বাস এ পদ্ধতির চাষাবাদে তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদে যেমনি রয়েছে সুবিধা, তেমনি রয়েছে বেশ কিছু সমস্যা। প্রধান সমস্যা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব। এ ছাড়া অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, প্রয়োজন অনুসারে বীজ তৈরির জন্য সার না পাওয়া এবং ঋণসুবিধা না থাকলে চাষিদের সমস্যায় পড়তে হয়। তবে সহজশর্তে এ চাষাবাদের উজিরপুরে আরো বিস্তৃতি ঘটবে। মানুষের আর্থিক অবস্থারও ব্যাপক উন্নতি হবে।-dailynayadiganta